:

সুন্দরবনের বদলে যাওয়া সমাজে মহিলারা

সুন্দরবনের বদলে যাওয়া সমাজে মহিলারা

গত পনের বছর ভারতীয় সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াতের সুযোগ পেয়েছি পত্রিকা সম্পাদনা এবং অন্যান্য কাজের সূত্রে৷উত্তর চব্বিশ পরগণার হিঙ্গলগঞ্জ ব্লক থেকে দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার সাগর ব্লক পর্যন্ত সমুদ্র এবং জঙ্গলের প্রান্তবাসী মানুষের জীবন যাপনের নিবিড় সান্নিধ্যলাভের সৌভাগ্য হয়েছে এবং হচ্ছে৷সৌভাগ্য হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে প্রবীণ নবীন নানা বয়সের মানুষের সঙ্গে মেশার এবং থাকার, যাঁরা কোনও না কোনও সময় সুন্দরবনের গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন অথবা এখনও আছেন৷এসব টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতার নির্যাসকে একত্রিত করেই বোঝার চেষ্টা করি সুন্দরবনের গ্রাম জীবনকে৷ গত পনের বছরে খুব দ্রুত কিছু বদল ঘটেছে পৃথিবীর বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ জঙ্গল ঘেঁষা গ্রাম গুলিতে৷ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রাকৃতিক বিপর্যয় সুন্দরবনের মানুষের নিত্যসঙ্গী৷এই বিপর্যয়ের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার অভ্যাস সুন্দরবনের প্রান্তবাসী মানুষের প্রায় সহজাত৷আজ যাঁদের আমরা সুন্দরবনের ভূমিপুত্র হিসাবে বিবেচনা করি তাঁদের সুন্দরবনের প্রান্তবর্তী গ্রামগুলিতে বসবাসের সময়কাল সর্বাধিক আড়াইশো বছর৷ পলাশীর যুদ্ধ পরবর্তীকালে ইংরেজরা যখন পাকাপাকিভাবে বাংলা বিহার ওড়িশার শাসনভার অর্জন করল তখন তাঁদের দৃষ্টি গেল বাংলার দক্ষিণ দিকের এই জল-জঙ্গল ঘেরা অপরিণত বদ্বীপ ভূমির দিকে৷রাজস্ব লাভের আশায় শুরু হল জঙ্গল কেটে চাষাবাদের চেষ্টা৷বাধা হয়ে দাঁড়াল জোয়ারের সঙ্গে ঢোকা নোনা জল এবং জল-জঙ্গলে থাকা হিংস্র জন্তুরা৷বাঘ,কুমিরের সঙ্গে লড়াইয়ে প্রাণ বিসর্জন দিতে দিতেও মানুষ জিতে যেতে থাকল৷নোনা জলকে আটকাতে ঘিরে ফেলা হতে লাগল দ্বীপের পর দ্বীপ,তৈরি হতে থাকল সুন্দরবনের জীবনরেখা নদী বাঁধ৷আজ আমরা যে সমাজের কথা আলোচনা করব সে সমাজের শুরু এইভাবে,এই সময়৷প্রসঙ্গত একথা উল্লেখ্য,সুন্দরবনের বিভিন্ন অংশে যেসব প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে সেগুলি পর্যালোচনা করে প্রায় সব বিশেষজ্ঞই নিশ্চিত যে এখন যেখানে সুন্দরবন এককালে আরও প্রাচীন সময়ে সেখানে মানুষের বসতি ছিল,কিন্তু এই আলোচনায় আমরা সেই সময়ের সমাজ জীবনের পরিপ্রেক্ষিত ব্যাখ্যা করছি না৷ ইংরেজদের হাত ধরে সেই গ্রাম সুন্দরবন আজ ভৌগোলিকভাবে এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়েছে,প্রথমে সে বিষয়ে একটু আলোকপাত করা প্রয়োজন৷গঠনগত দিক থেকে সুন্দরবন একটি সক্রিয় বদ্বীপ৷ভারতীয় অংশে উত্তর থেকে আসা নদী গুলির মধ্যে একমাত্র হুগলী নদী ছাড়া সবগুলিরই উৎস থেকে প্রবাহপথ রুদ্ধ৷নদী বাহিত পলির পরিমান কমে এলেও সাগর থেকে জোয়ারের সময় আসা বিপুল পরিমান পলিতে আজও এই অঞ্চলে ভূমি গঠনের কাজ চলছে৷দু-আড়াইশো বছর ধরে যে দ্বীপগুলি বাঁধ দিয়ে ঘেরা অবস্থায় রয়েছে সেসব দ্বীপে কিন্তু নতুন করে পলি সঞ্চয়ের কাজ ব্যাহত হয়েছে৷এদিকে নদী গুলির মধ্যে ক্রমাগত পলি সঞ্চয়ে নদীর নাব্যতা ক্রমশই কমছে৷তাই আজ ভরা জোয়ারের সময় নদীর জলের সর্বোচ্চ সীমার অনেক নিচে থাকে গ্রাম সুন্দরবন৷অনেক সময় একটি কথা বলতে শোনা যায় সুন্দরবনের মানুষ জলের নিচে বসবাস করেন৷কথাটি আশ্চর্য শোনালেও আক্ষরিক অর্থেই সঠিক,আমরা ভরা জোয়ারের সময় চামচের মত আকৃতির দ্বীপ গুলিতে গ্রামের বাড়ির ছাদ গুলিকে আমাদের নৌকার উচ্চতা থেকে অনেকটা নিচে দেখতে পাই৷এই জলরাশি এবং গ্রামের মাঝেই রয়েছে নদীবাঁধ৷যে বাঁধের নির্মাণ শুরু হয়েছিল ইংরেজ আমলে সেই বাঁধের উচ্চতা বারবার বাড়াতে হয়েছে, কারণ খুব স্বাভাবিক নদীর নাব্যতা যত কমেছে তত বেড়েছে জলতলের উচ্চতা৷উচ্চতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কোথাও কোথাও বদলেছে বাঁধের ধরন,ইংরেজ আমলের মাটির বাঁধ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মতাদর্শের নেতা ও বিশেষজ্ঞদের সুচিন্তিত মতামতের হাত ধরে বারবার তার রূপ বদলেছে এবং বদলাচ্ছে৷এতকিছুর পরও বহু জায়গায় আজও জীর্ণ মাটির বাঁধের ভরসায় সুন্দরবনের মা তাঁর শিশুকে নিয়ে রাতে ঘুমাতে যান৷সমস্যা হল চামচের মত আকৃতি বিশিষ্ট সুন্দরবনের গ্রামগুলিতে প্রবল জোয়ারে বা ঘূর্ণিঝড়ের দাপটে যখন বাঁধের ক্ষতি হয়,বাঁধ ভেঙে বা টপকে জোয়ারের জল ঢোকে গ্রামে তখন জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে যায়৷বর্ষাকালের প্রবল বৃষ্টির জল গ্রামের মধ্যে জমে থাকলে সুন্দরবনের মানুষ আতঙ্কিত হন না,কারণ সেই মিষ্টি জল তাঁদের কাছে অতি মূল্যবান৷তাঁদের আতঙ্কের কারণ বাঁধ ভেঙে ঢোকা নোনা জল৷এই জল গ্রামে ঢোকা মানেই কৃষিজ ফসল নষ্ট শুধু নয় আগামী কয়েক বছরের জন্য কৃষি জমিরও উৎপাদনশীলতা কমে বা নষ্ট হয়ে যাওয়া৷এই জল গ্রামে ঢোকা মানেই মিষ্টি জলের পুকুর গুলি নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং পুকুরের মাছ নষ্ট হয়ে যাওয়া৷বিধ্বংসী বিপর্যয়ের পর তাই তিল তিল করে গড়ে ওঠা গ্রাম সুন্দরবন এক লহমায় পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে৷ আমার দূর্ভাগ্য এমনই এক মহা বিপর্যয়ের পর আমার সঙ্গে সুন্দরবনের নিবিড় সম্পর্কের সূচনা৷সালটা ২০০৯,সুন্দরবনের উপর দিয়ে বয়ে গিয়েছে এক বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় আইলা৷ ভরা জোয়ারের সময় ঘূর্ণিঝড়ের ল্যান্ডফল হওয়াতে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নদী বাঁধ ভেঙে জল ঢুকেছিল বহু গ্রামে৷কৃষিকাজ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল আগামী কয়েক বছরের জন্য৷জমে থাকা জল লবণাক্ত করে দিয়েছিল মাটির উপরের স্তর৷মিষ্টি জলের পুকুর নষ্ট হয়ে গিয়েছিল কয়েক মিনিটের মধ্যে৷চোখের সামনে বদলে যেতে দেখলাম ভূমির ব্যবহার, মানুষের জীবিকা।তিন পুরুষের চাষী এক লহমায় হয়ে যেতে লাগলেন চিংড়ি বা কাঁকড়ার ঘেরের শ্রমিক৷সে এক অবর্ননীয় দুঃসময় সুন্দরবনের৷ যাঁর হাত ধরে সুন্দরবন দেখতে শিখেছি সেই শ্রদ্ধেয় তুষার কাঞ্জিলাল সেই সময় "আইলা: সুন্দরবনের শেষের শুরু" শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন৷তখন তার অর্থ পুরোপুরি বুঝতে পারিনি কিন্তু আজ স্পষ্ট বুঝতে পারছি সে কথার অর্থ৷ বিধ্বংসী এই ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি সামলে গ্রাম সুন্দরবন হয়তো আবার ছন্দে ফিরেছে ধীরে ধীরে কিন্তু এই প্রান্তিক গ্রামগুলির সামাজিক পরিকাঠামোয় ঐ প্রাকৃতিক বিপর্যয় যে চিরস্থায়ী হতাশাজনক প্রভাব ফেলেছে তার ফল আজও ভুগতে হচ্ছে নিশ্চিতভাবে৷ বদলে যাওয়া এই গ্রামগুলিতে মেয়েদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনার আগে এই বদলগুলি মূলত কী ধরনের সেবিষয়ে একটু দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন৷ আইলা পরবর্তী সুন্দরবন প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির ধাক্কা সামলে ওঠার পর যে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী সমস্যার সম্মুখীন হল সেটি জীবিকার সংকট৷কৃষির সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা বিপর্যয়ের কয়েকদিন পর থেকেই বুঝতে পারলেন আগামী কয়েকবছর স্বাভাবিক চাষাবাদ করা সম্ভব হবে না৷বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এবং সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রাপ্ত ত্রাণ কিছুদিনের অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা করেছিল কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মে কিছুদিন পর সংবাদ মাধ্যম এবং অন্যান্যদের নজর অন্য অধিকতর উত্তেজনাপূর্ণ বিষয়ের দিকে আকর্ষিত হল৷গ্রাম সুন্দরবনের মানুষের সামনে তৈরি হল অস্তিত্বের সংকট৷টিকে থাকার সেই মরণপণ লড়াইয়ে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র কাজে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও বিকল্প ছিল না৷যে সুন্দরবনে একদিন মানুষ এসেছিলেন নতুন কাজের খোঁজে সেই সুন্দরবন থেকে এত ব্যাপক হারে বিপরীতমুখী পরিযানের নিদর্শন সাম্প্রতিক অতীতে নজরে আসেনি৷নদীতে মাছ,কাঁকড়া ধরা এবং নিজের বা অন্যের জমিতে কৃষিকাজে যুক্ত থাকা সাধারন গ্রামের মানুষ সুন্দরবনের বাইরে দেশের অন্য প্রদেশে বা কিছু ক্ষেত্রে বিদেশে গিয়ে যুক্ত হতে লাগলেন এমন সব পেশার সঙ্গে যেসব পেশায় তাঁদের পূর্বপুরুষেরা কোনও কালে যুক্ত থাকেন নি৷ফলত সুন্দরবন থেকে দেশ বিদেশে ছড়িয়ে যাওয়া এইসব মানুষ অদক্ষ শ্রমিক হিসাবে স্বল্প মজুরিতে কাজে যুক্ত হতে লাগলেন৷এসব কাজ করে বাড়িতে পাঠাতে পারেন এমন অর্থের পরিমাণ নিতান্ত সামান্যই৷গ্রামে থাকা স্ত্রী,ছেলে-মেয়ে বা বয়স্ক বাবা-মার দেখাশোনার ভার তাই এসে পড়ল মূলত গ্রামের মেয়েদের উপর৷ প্রান্তিক গ্রামগুলিতে অনেক পরিবারেই পুরুষ সক্ষম প্রতিনিধিকে ঘর ছেড়ে থাকতে হচ্ছিল বাইরে৷বয়স্ক এবং শিশুদের নিয়ে গ্রামে রইলেন মহিলারা৷অস্বীকার করে লাভ নেই আজও আমাদের দেশের সমাজে পুরুষই পরিবারের মূল চালিকা শক্তি৷এর মূল কারণ অবশ্যই অর্থনৈতিক৷অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন আজও আমাদের মহিলাদের ক্ষেত্রে অনেক অর্থেই অধরা৷প্রশাসনিক ক্ষেত্রে মহিলাদের হাতে ক্ষমতা প্রদানের উদ্দেশ্যে পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় মহিলা প্রতিনিধি গ্রহণের নীতি বহুদিন আগেই গৃহীত হয়েছে৷কিন্তু সে নীতির বাস্তবিক প্রয়োগ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মুখ ধুবড়ে পড়েছে৷সুন্দরবন ছাড়াও বাংলার বেশ কিছু প্রত্যন্ত গ্রামে নিয়মিত যাতায়াতের সূত্রে দেখেছি পঞ্চায়েতে বিজয়িনী আসলে শুধুমাত্র সই করেই তাঁর দায়িত্ব সারেন, বাকি সব কাজ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তাঁর স্বামী৷আসলে যে কারণে আমরা প্রশাসনিক স্তরে মহিলা প্রতিনিধি রাখার কথা ভেবেছিলাম তা অনেকাংশেই ব্যর্থ হয়েছে বলা যায়৷ হাজার হতাশার মাঝেও আইলা পরবর্তী সুন্দরবনে এই ব্যর্থতার কিছুটা বিপরীত ছবি দেখেছিলাম এবং আজও দেখছি৷পরিবারের প্রায় সব ধরনের কাজের ভার যেভাবে সুন্দরবনের মেয়েরা আজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না৷ কৃষিকাজে ধান রোয়া থেকে কাটা,ধান ঝাড়াই করে ঘরে তোলা সবেতেই তাঁরা ভীষণভাবে সক্রিয়৷পরিবারের পুরুষ মানুষের দীর্ঘকালীন অনুপস্থিতি তাঁদের স্বাবলম্বনের পথে নিয়ে যাচ্ছে কিনা সে প্রশ্নের উত্তর নিয়ে সমাজ বিজ্ঞানীরা গবেষণা করতে পারেন৷ শুধুমাত্র কৃষিতে নয়, আপনারা যাঁরা নিয়মিত বা অনিয়মিতভাবে সুন্দরবনে যান তাঁরা একটু লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন মাছ বা কাঁকড়া ধরার ছোট ছোট নৌকা গুলিতে পুরুষ-মহিলার সংখ্যার অনুপাত ক্রমশই মহিলাদের দিকে বাড়ছে৷ কোনও কোনও নৌকাতে চারজনের মধ্যে তিন জন মহিলা একজন পুরুষ দেখা যায়৷আবার একটি নৌকাতে জাল সহ তিন জন মহিলাও বিরল নয়৷ শুধুমাত্র গহন সুন্দরবনে মধু ভাঙতে যাওয়া দলগুলিতে বা গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া ট্রলারগুলিতে ছাড়া সুন্দরবন অঞ্চলের প্রায় সব ধরনের জীবিকাতে মহিলাদের সক্রিয় উপস্থিতি গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়৷ আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করেছি ব্যাঙ্কিং পরিষেবায় মহিলাদের অংশগ্রহণ করার ক্ষেত্রে৷সুন্দরবনের গ্রাম গুলির বেশকিছু জায়গাতেই বিভিন্ন রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাঙ্ক তাদের মাধ্যমে টাকা লেনদেনের জন্য কিছু বেসরকারি সংস্থাকে দায়িত্ব দিয়েছে৷এইসব সংস্থা একটি বা দুটি ছেলেকে একটি কম্পিউটার দিয়ে বাজার বা হাটের কাছে একটি দোকান ঘরে বসিয়েছে৷এদের মাধ্যমেই টাকার লেনদেন করতে পারেন গ্রামের মানুষ৷আইলার পর থেকে যখন গ্রামের মানুষকে বাধ্য হয়ে অন্যত্র যেতে হল তখনই এই পরিষেবা নিত্য প্রয়োজনীয় হতে থাকল৷প্রথম দিকে টাকা তোলা বা কত টাকা জমা আছে এসব তথ্য বুঝে নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে মহিলাদের বেশ জড়তা লক্ষ্য করতাম যত দিন যাচ্ছে এসব কাজে মহিলারা অনেকটাই সাবলীল হয়ে উঠছেন৷ ছোটদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে মায়েদের ভূমিকা সর্বত্র এবং সব কালেই অতীব গুরুত্বপূর্ণ ছিল৷আজকের সুন্দরবনে এক্ষেত্রেও মায়েরা অনেকটা অগ্রণী৷বাবা দূরে থাকায় স্কুলে গিয়ে মাস্টারমশাইদের কাছ থেকে পড়াশোনা এবং অন্যান্য পরিষেবা সংক্রান্ত খোঁজখবর নেওয়ার ক্ষেত্রে মায়েরা যথেষ্ট সক্রিয়৷তাঁরা পড়াশোনা যতটুকুই জানুন অনেকেই আগামী প্রজন্মের কাছে পড়াশোনার গুরুত্ব কতটা সেটা অনুভব করেন ভাল ভাবেই৷ আর একটি বিষয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি৷অন্যান্য অঞ্চলের মত সুন্দরবনের গ্রামগুলিতেও নেশার প্রকোপ অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে৷গ্রামে থাকা পুরুষদের নেশা করে অর্থ এবং শরীর নষ্ট করতে প্রায়ই দেখা যায়৷বেশ কয়েকবার মদ তৈরি কেন্দ্র গুলিকে নষ্ট করে দিতে গ্রামের মহিলাদের সক্রিয় মারমুখী ভূমিকা নিতে দেখেছি৷ একটি বিষয় আমাকে বেশ বিস্মিত করে আমাদের দেশে জনগণনার তথ্যে নারীদের কর্মহীন বা নন ওয়ার্কার হিসাবে চিহ্নিত করা হয়৷অথচ আজকের গ্রাম সুন্দরবনের যেকোনও প্রান্তিক পরিবারের সঙ্গে যদি আপনি একটি গোটা দিন কাটান তাহলে দেখবেন সেই পরিবারের একজন মা ভোর রাত থেকে কি পরিমাণ পরিশ্রম করেন৷ নামখানা ব্লকের মৌসুনি দ্বীপের সর্ব দক্ষিণ প্রান্তের গ্রাম বালিয়াড়াতে বসবাসকারী পরিবারগুলিকে বংশ পরম্পরায় উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ে সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয়৷সামান্য একটু পানীয় জল সংগ্রহ করতে তাঁদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়৷আজ বালিয়াড়ার অনেক পুরুষ মানুষ তামিলনাড়ু,কেরালা বা আরব রাজ্য গুলিতে কর্মরত৷গৃহস্থালীর কাজ মিটিয়ে বালিয়াড়ার আনোয়ারা বিবি অবলীলায় তাঁদের ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে চলে যান৷শুধু মাছ ধরা নয় সেই মাছ কোন ব্যবসায়ীর 'খটি'তে বিক্রি করলে ঠকে যাবেন না সে বিষয়েও তিনি যথেষ্ট সচেতন৷ পাথরপ্রতিমা ব্লকের জি-প্লট দ্বীপের দক্ষিণতম গ্রাম গোবর্ধনপুরের বাসিন্দা কৌশিক মাইতি আইলার পর থেকে অন্তত দশ বার তাঁর পেশা বদলেছেন বেঁচে থাকার জন্য৷রাজমিস্ত্রিরির সাহায্যকারী,দক্ষিণ ভারতে ধান চাষের মজুর,আন্দামানে জুতোর কারখানার শ্রমিক হিসাবে কাজ করে কয়েক বছর পর বাড়ি ফিরে ইলিশ মাছ ধরার ট্রলারে গভীর সমুদ্রে গেছেন বেশ কয়েকবার৷দুবছর আগে আবার ভাগ্যানুসন্ধানে কাজ নিয়েছেন বর্ধমানের একটি চাল-কলে৷কৌশিকের স্ত্রী তাদের দুটি ছেলে মেয়ে নিয়ে গ্রামেই থাকে৷ক্রমাগত ভূমিক্ষয় তাদের ছোট বাসস্থানটিকে বারবার বিপন্ন করে৷এই গ্রামে এমন পরিবারও আছেন যাঁদের গত পনের বছরে অন্তত পাঁচবার বাসস্থান সরিয়ে আনতে হয়েছে উত্তরদিকে৷কৌশিকের স্ত্রী গ্রামে থেকে তার দুই ছেলে মেয়েকে মানুষ করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যায়৷গ্রামে দুয়ারে সরকারের ক্যাম্প হলে নিজেই লাইনে দাঁড়ায় নিজের প্রাপ্য কেন মিলছে না তার জবাব পেতে৷মেয়ে নাইন পাশ করে ক্লাস টেনে উঠে গেল তবু কেন তার প্রাপ্য সাইকেল সে পেল না সেই খোঁজ নিতে সটান স্কুলের প্রধান শিক্ষকের ঘরে চলে যায় অবলীলায়৷ পরিবারের পুরুষ মানুষের অনুপস্থিতি তাকে নানা সমস্যার সম্মুখীন করতে করতে স্বাবলম্বীও করে তুলেছে৷ জলবায়ু পরিবর্তনে সমুদ্রতলের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে পৃথিবীর যেসব দ্বীপ অতি দ্রুত জমি হারাচ্ছে ভারতীয় সুন্দরবনের ঘোড়ামারা তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান৷গত একশ বছরে ঘোড়ামারা তার মোট আয়তনের অষ্টাশি শতাংশ জমি হারিয়েছে৷এর আগে ঘোড়ামারার পাশের দ্বীপ লোহাচড়া তো সম্পূর্ণ ধ্বংসই হয়ে গেছে৷প্রায় নিশ্চিত ধ্বংসের মুখে থাকা ঘোড়ামারা দ্বীপে এখনও যাঁরা বসবাস করছেন তাঁদের পরিবারের মহিলাদের মধ্যেও লক্ষ্য করি অদম্য বেঁচে থাকার আকুতি,জীবনের প্রতি অপরিসীম ভালবাসা৷ইয়াস ঘূর্ণিঝড়ে সর্বস্ব হারানো গৃহবধূ শেফালী মণ্ডলের সঙ্গে বিপর্যের দু দিন বাদেই দেখা হয়েছিল৷মৃদু হেসে সে আমাকে বলেছিল "মাস্টার এমন দেশ আর আর কোথাও গেলে আমরা পাব না"৷চমকে উঠেছিলাম৷ইয়াসের দিন মাত্র আধ ঘন্টার মধ্যে গোটা ঘোড়ামারা দ্বীপ সম্পূর্ণ জলের নিচে চলে গিয়েছিল৷কয়েক মিনিটের মধ্যে কোলের মেয়েটিকে নিয়ে সে কোনও মতে পৌঁছেছিল কাছের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে৷শেফালীর মত ঘোড়ামারার অনেক গৃহবধূর স্বামীই গোয়া বা মুম্বাইয়ের হোটেলে রান্নার কাজ করে৷বিপর্যয়ের সংবাদ ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাদের কাছে পৌঁছালেও কাজের বাধ্যবাধকতায় তাদের গ্রামে ফেরার উপায় থাকে না৷কাজেই সংসারের অন্য অনেক ঝড় ঝাপটাকে সামলানোর সঙ্গে সঙ্গে আক্ষরিক অর্থে প্রতি ঘন্টায় একশ আশি কিলোমিটার বেগে ছুটে আসা ঝড় একা সামলে বেঁচে থাকতেও শিখে যাচ্ছে শেফালীরা৷ গোসাবা ব্লকের সাতজেলিয়ার সুচিত্রা মণ্ডলের বয়স হয়েছে, এককালে স্বামীর সঙ্গে জঙ্গলে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বাঘের মুখোমুখি হয়েছিলেন৷প্রাণপণ লড়াই করেও বাঘের মুখ থেকে স্বামীকে ছিনিয়ে আনতে পারেন নি৷ঝিলার জঙ্গলে স্বামীকে পিঠে নিয়ে হারিয়ে গেছে রয়াল বেঙ্গল টাইগার৷গ্রামের মানুষ খবর পেয়ে তিন দিনের মাথায় খূঁজে এনেছিল স্বামীর তেল চিটে গামছাটি৷সে গামছায় লেগেছিল স্বামীর রক্তের দাগ৷সেই গামছাটি খড় দিয়ে বানানো নকল মৃতদেহের গায়ে জড়িয়ে বাবার শেষ কৃত্য করেছিল সুচিত্রার দুই ছেলে৷তারপর কেটে গেছে অনেকগুলি বৃষ্টি ভরা ভাদ্র মাস৷আইলার পর সুন্দরবন ছেড়ে সুরাটে সোনা-রূপোর কাজে গেছে সুচিত্রার দুই ছেলে৷সংসার চলার মত অর্থের সংস্থান থাকলেও দুই ছেলের কারও সংসারেই ঠাঁই হয়নি সুচিত্রার৷আইলায় ভেঙে যাওয়া নদী বাঁধ থেকে বেশ কিছুটা পিছিয়ে নতুন শক্ত সমর্থ বাঁধ হয়েছে বছর কয়েক আগে৷নতুন বাঁধ আর পুরানো ভেঙে যাওয়া বাঁধের মাঝে থাকা বিপদজনক জায়গায় ছোট্ট ঘর বেঁধে বাস করেন সুচিত্রা মণ্ডল৷প্রায় প্রতিটি অমাবস্যা পূর্ণিমার ভরা জোয়ারে তাঁর ঘরে নোনা জল ঢোকে৷সরকারি নিয়মের ফাঁদে আটকে মেলেনা বিধবা বা অন্যান্য ভাতা৷ছেলেরা দেখে না বলে বৃদ্ধার মুখে কোন আক্ষেপ শুনি না,বলেন "সে তো বাপ শহরেও শুনি কত বড় বড় ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বাপ-মাকে দেখে না"৷ সকাল সকাল নিজের ছোট্ট জাল নিয়ে গাঁড়াল নদীর ধারে ঘেঁসে মাছ কাঁকড়া ধরার চেষ্টা করেন৷কোনও দিন ভাল মন্দ জোটে,কোনও দিন জোটে না৷নিজেই বাজারে পাইকারের কাছে বিক্রি করে তেল,নুন,আলু কিনে ঘরে ফেরেন৷কাঠের উনুনে ফুটিয়ে নেন রেশনের চাল৷ যতবার দেখা হয়েছে বাধ্য করেছেন ওনার সঙ্গে বসে ভাত খেতে৷জীবন সম্পর্কে হাজার অভিযোগে কখনও তাঁকে ভেঙে পড়তে দেখি নি৷তাঁর ধরা কাঁকড়া দাঁতের জোরে ভেঙে খেতে পারছি না দেখে ফোকলা মুখে হেসে উঠে হাতার উল্টো পিঠ ভেঙে দিয়ে বলেছেন "এবার খা"৷ বলেছি কত ভাল ভাল হোটেলে খেয়েছি ঠাকুমা কিন্তু তোমার মত কেউ রান্না করতে পারে না৷কি মমতায় প্রাণভরে হেসে উঠেছেন,সে হাসি দেখে বুঝেছি সুন্দরবনের মেয়েরা,সুন্দরবনের মায়েরা কখনও হারতে জানেন না৷এই অদম্য শক্তিই হাজার বিপর্যয়ের মাঝেও সুন্দরবনকে টিকিয়ে রেখেছে এবং আগামীদিনেও রাখবে৷ (রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের মুখপত্র "উদ্বোধন" পত্রিকার পৌষ ১৪৩০ সংখ্যায় প্রকাশিত৷)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *